জন্ম থেকেই দুটি হাত সম্পূর্ণ অচল। তাই অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো পড়ালেখার স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থনে জয় করে সিরাজগঞ্জের নিলা খাতুন পা দিয়ে লিখেই সফলভাবে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এখন তার একমাত্র স্বপ্ন—সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে সমাজের অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ সৃষ্টি করা।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চর বরধূল গ্রামের দিনমজুর উসমান গনি ও শাহিনুর বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় নিলা খাতুন। জন্ম থেকেই দুই হাত অচল থাকলেও তিনি কখনো নিজের স্বপ্নকে থামতে দেননি। বরং ছোটবেলা থেকেই পা দিয়ে লেখা শিখে একের পর এক শিক্ষাজীবনের ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছেন।
নিলা জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার পর থেকেই তিনি পা দিয়ে কলম ধরার অনুশীলন শুরু করেন। প্রথমদিকে মা তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন এবং বাড়ি ফিরিয়ে আনতেন। পরে দাখিল মাদ্রাসায় পড়ার সময় শিক্ষক ও সহপাঠীদের সহযোগিতায় তার পথচলা আরও সহজ হয়।
শুধু লেখাপড়াই নয়, দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজই তিনি পা দিয়ে করেন। তরকারি কাটা, মাছ পরিষ্কার করা, উঠান ঝাড়ু দেওয়া, এমনকি টিউবওয়েল চাপিয়ে পানি তোলার মতো কাজও তার কাছে এখন স্বাভাবিক বিষয়।
নিলা আলিম ও ফাজিল সম্পন্ন করার পর এবার সফলভাবে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষক নিবন্ধনের (এনটিআরসিএ) জন্য আবেদন করেছেন। তার বিশ্বাস, একটি সরকারি চাকরি পেলে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম সার্থক হবে।
নিলা বলেন, “শিক্ষকতা আমার খুব প্রিয়। সুযোগ পেলে আমি শুধু নিজের জীবনই বদলাতে চাই না, বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদেরও সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে চাই।”
মা শাহিনুর বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের পড়াশোনার প্রবল ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছাশক্তিই আজ তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। তিনি আশা করেন, সরকার নিলার যোগ্যতার মূল্যায়ন করে একটি চাকরির সুযোগ করে দেবে।
বাবা উসমান গনি বলেন, দিনমজুরের সামান্য আয়ে অনেক কষ্ট করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে এখন আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তাই মেয়ের একটি সরকারি চাকরির জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
কামারখন্দ ফাজিল মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শমসের আলী বলেন, নিলা অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও সংগ্রামী একজন শিক্ষার্থী। দুই হাত অচল থাকা সত্ত্বেও পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স সম্পন্ন করা তার অসাধারণ অর্জন। তিনি মনে করেন, এমন শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রের বিশেষ সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, নিলার এই সাফল্য শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি সমাজের সব প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আশা, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত